দীর্ঘজীবন লাভের উপায় (পর্ব-৩৮) : ধূমপানের সাথে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্পর্ক
ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক এবং উচ্চ রক্তচাপের প্রকৃত কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় জানার মাধ্যমে
দীর্ঘজীবন লাভের উপায়
ধূমপানের সাথে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্পর্ক
বিগত পাঁচ বছরে আমাদের বাড়ির যে ৩ জন বয়স্ক পুরুষ মারা যান, তাদের একজন মারা যান ক্যান্সারে, অন্য দু’জন অন্য রোগে। যিনি ক্যান্সারে মারা যান, তাঁর নাম জালাল আহমদ। ধূমপান করতেন না। আর যে দু’জন ক্যান্সারে মারা যাননি, তাঁদের এজনের নাম ছিল আবুল খায়ের, অপরজনের নাম আবুল বাশার। এই দু’জন ছিল আবার সহোদর ভাই। উভয়কেই আমার জন্মের পর থেকে দেখছি নিয়মিত ধূমপান করেন। আবুল বাশার আবার একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। তবু ক্যান্সার তাঁকে আক্রমণ করতে পারেনি। অন্যদিকে আমার নানা মারা গেছেন ক্যান্সারে। ধূমপান করতেন না। আমাদের বাড়ির দক্ষিণের বাড়ির কাজী সিরাজ নামক একজন লোকের কথা একটু আগে উল্লেখভ করেছিলাম যিনি কয়েক যুগ ধরে ধূমপান করেছেন। কিন্তু ক্যান্সারে মারা যান নি। এসব উদাহরণ অবশ্য এটা প্রমাণ করে না, ধূমপান না করলে ক্যান্সার হয় আর ধূমপান করলে ক্যান্সার হয় না! কী প্রমাণিত হয়, তা বলার আগে আরো কিছু ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন।
আমাদের বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির সুমাইয়া নামক এক শিক্ষার্থীর এক খালাতো ভাই, যার বয়স ১৮ বছর ছিল, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্যান্সারে মারা যায়। ছেলেটি ধূমপান করতো না। আমার পরিচিত একজনের গাড়িতে করে সেদিন এক জায়গায় যাচ্ছিলাম। কথায় কথায় তিনি বেশ পরিতাপের সাথে জানালেন, তাঁদের এলাকার একটা ছেলে কয়েকদিন আগে বিয়ের মাত্র চার মাসের মাথায় ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। ছেলেটির বয়স হবে ৩০-৩২ বছর। সবচেয়ে বড় কথা, ছেলেটি ধর্মীয় ভাবধারায় পড়াশুনা করায় ধূমপানের সাথে তার কোনো সম্পর্কই ছিল না। তবু ক্যান্সার তাকে ছাড়লো না! আমার এক প্রাক্তন সহকর্মীর নাম মনির হোসাইন। তাঁর পাঁচ-ছয় বছর বয়সী একটি মেয়ে ক’বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিল। চিকিৎসার পর বছর দুয়েক ভালো ছিল। পরে হঠাৎ একদিন মারা যায়। ছোট্ট সেই মেয়েটি কি ধূমপান করত, নাকি তার বাবা-মা?! ওর বাবা, মানে আমার ওই সহকর্মী তো একজন ভালো ‘আলেম’। ধূমপানের পরোক্ষ ক্ষতির কথাও এখানে প্রয়োগ করার সুযোগ নেই! বাংলাদেশের জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন অনেক বছর আগে একবার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত হবার পর সুচিকিৎসা পেয়ে ক্যান্সার থেকে মুক্তি পেয়ে এখনো জীবিত আছেন। বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় লেখক জাহানারা ইমাম ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মহিলা, বংলাদেশে যারা ধূমপান থেকে দূরে থাকেন, তারাও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়।
২০০৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার হাসানপুরে অবস্থিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমার চাকরি হয়েছিল। বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তখন ৩০% মহিলা শিক্ষক নিয়োগের একটি অস্থিতিশীল নিয়মের প্যাঁচে পড়ে আমার চাকরিটি স্থায়ী হয়নি। সেখান থেকে আমাকে তাই পরে চলে আসতে হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানে মাঈন উদ্দিন নামে একজন শিক্ষক ছিলেন, যিনি ধর্মীয় ধারায় শিক্ষিত একজন আলেম। আমি ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জানতে পারলাম, ইতিপূর্বে তাঁর ক্যান্সার হয়েছিল। উপযুক্ত চিকিৎসা পেয়ে তিনি সুস্থ হয়ে গেছেন।
আমাদের বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী-অভিভাবক একদিন কথায় কথায় বললেন, ক্যান্সারে আক্রান্ত তাঁর এক আত্মীয়ের সাথে তিনিও একবার ঢাকার একটি ক্যান্সার হাসপাতালে যান। দেখতে পান, অন্য সব মানুষের পাশাপাশি অনেক বড় বড় আলেমও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে সেখানে চিকিৎসার জন্য ভীড় করছেন। দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় ভাবধারায় শিক্ষিত অনেক আলেমও মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। অথচ এরকম মানুষগুলো ধূমপানকে শুধু এড়িয়ে চলেন না, রীতিমতো ঘৃণার চোখে দেখেন।
আমার এক সহকর্মীর নাম মরিয়ম বেগম। তাঁর এক ভাইয়ের পর পর দু’টি মেয়ে হবার পর একটি ছেলে হয়েছে। ছেলেটির বয়স যখন দু’বছরও পূর্ণ হয়নি, তখন তার দেখা দিল ক্যান্সার। মাথায় ফোঁড়ার মতো বড় বড় বোঁটা সৃষ্টি হলো। সেগুলো বেড়ে গিয়ে পঁচতে শুরু করলো। প্রাথমিক অবস্থায় কেউ বুঝতে পারেনি এটা যে ক্যান্সার ছিল। পরে যখন বুঝা গেলো এটা ক্যান্সার, তখন আর কোনো চিকিৎসা কাজে আসেনি। শিশুটি শেষে মারাই গেলো। ঘটনা কিন্তু তখনও শেষ হয়নি। শিশুটি মারা যাবার পর পরই ওর মায়ের শরীরে ক্যান্সার ধরা খেলো। ওর মায়ের ক্যান্সারের বিষয়টা প্রকাশ পাবার পর সবাই বুঝতে পারলো, ওর মায়ের শরীরে ক্যান্সার হয়তো আগেই জন্ম নিয়েছিল। মায়ের দুধ খাওয়ার কারণে শিশুটির শরীরেও ক্যান্সারের সংক্রমণ ঘটেছে। শিশুটি মারা যাবার কিছুদির পর ওর মা-ও ক্যান্সারে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। অনেক টাকা খরচ হল দু’জনের পেছনে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এই শিশুটি ও তার মায়ের ক্যান্সার হবার পেছনে কেউ কি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ধূমপানকে দায়ী করতে পারেন? শিশুটির বাবা তথা আমাদের সহকর্মী মরিয়ম বেগমের ভাই কখনোই ধূমপান করতেন না।
শিশুদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ঘটনা এখন বিরল নয়, অনেক অনেক শিশু এখন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রায়ই পত্রিকায় অনেক শিশুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সংবাদ ছাপা হয়। ১ মার্চ ২০১৮ তারিখের দৈনিক মানবকন্ঠে ‘ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশু ইমাম বাঁচতে চায়’ শিরোনামে একটি সংবাদ ছাপা হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখের দৈনিক সমকালে ‘বাড়ছে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয় ইন্টারন্যাশনাল চাইল্ডহুড ক্যান্সার (আইসিসি) কর্তৃক পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে। তাতে বলা হয়, ‘ইন্টারন্যাশনাল চাইল্ডহুড ক্যান্সারের জরিপে বলা হয়েছে, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় আড়াই লাখ শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে বছরে এ সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার।’
যদি প্রশ্ন করা হয়, কেন শিশুরাও ব্যাপকহারে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়? ধূমপানকে যারা মারাত্মক সব রোগের জন্য দায়ী ভাবতে পছন্দ করেন, তারা বলতে পারেন, শিশুরা ধূমপান না করলেও কী হবে, আশপাশে যারা ধূমপান করে, তাদের ধূমপানের পরোক্ষ ক্ষতির ফল হচ্ছে শিশুদের এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া। এসব লোকের কথা শুনলে মনে হয়, শিশু থেকে বৃদ্ধ সকল মানুষের সকল রকম ক্যান্সারের জন্য ধূমপানই দায়ী, কারো ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ, কারো ক্ষেত্রে পরোক্ষ! মনে হয়, ক্যান্সার শুধু ধূমপানের কারণেই হয়, ধূমপান ছাড়া ক্যান্সারের আর কোনো কারণ নেই!
এসব লোক অবাক হবে, প্রতিবেদনটিতে শিশুদের ক্যান্সারের কারণ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা জানলে। বলা হয়েছে, ‘জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, খাদ্য গ্রহণের কারণে ক্যান্সার বেড়ে যাওয়ার ঘটনা। অতিরিক্ত মাত্রায় ফাস্টফুড গ্রহণ, কোমল পানীয় পান করা, শাকসবজি কম খাওয়াসহ অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে শিশুরা বেশি ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকের বংশগত কারণেও ক্যান্সার হচ্ছে।’
এটা হচ্ছে, শিশুদের ক্যান্সারের কারণ সম্পর্কে একজন ডাক্তারের অভিমত। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কী বলছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে শিশুদের ক্যান্সার সম্পর্কে Cancer in Children শিরোনামে একটি গবেষণামূলক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘‘Unlike cancer in adults, the vast majority of childhood cancers do not have a known cause. Many studies have sought to identify the causes of childhood cancer, but very few cancers in children are caused by environmental or lifestyle factors. Cancer prevention efforts in children should focus on behaviours that will prevent the child from developing preventable cancer as an adult.’’ [http://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/cancer-in-children]
প্রকৃতপক্ষে শিশুদের ক্যান্সারের নির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরোক্ষ ধূমপানকে যারা কথায় কথায় ক্যান্সারসহ নানা ভয়ঙ্কর রোগের জন্য দায়ী করছেন, তারা নিজেদের চিন্তাধারা আরো শুধরে নিতে হবে।
৩৯তম পর্ব:
https://waytogainlonglife.blogspot.com/2022/09/blog-post_42.html

0 Comments: