Headlines
Loading...
দীর্ঘজীবন লাভের উপায় (পর্ব-৩৬) : ধূমপান ও তামাক সেবনের সাথে স্ট্রোকের সম্পর্ক

দীর্ঘজীবন লাভের উপায় (পর্ব-৩৬) : ধূমপান ও তামাক সেবনের সাথে স্ট্রোকের সম্পর্ক

ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক এবং উচ্চ রক্তচাপের প্রকৃত কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় জানার মাধ্যমে
দীর্ঘজীবন লাভের উপায়






ধূমপান ও তামাক সেবনের সাথে স্ট্রোকের সম্পর্ক


আমার ছোট বোনের শাশুড়ি বেশ কয়েক বছর আগে স্ট্রোকে (মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত) আক্রান্ত হয়েছেন। এখনো বেঁচে আছেন। তবে কষ্টে কাটছে তাঁর দিন। তাসনীম আক্তার হাফসা নামক আমার এক ছাত্রীর নানা বছর দুয়েক আগে স্ট্রোকে মারা গেছেন হঠাৎ। হালকা-পাতলা ছিলেন। ধূমপান করতেন না। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভুঁইয়া বাড়ির একজন লোক আছে দুলাল নামে, স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে এখন খুব কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন। ধূমপান করতেন না। দর্জি বাড়ি নামে আমাদের পার্শ্ববর্তী আরেক বাড়ির একজন লোক আছেন চৌধুরী নামে, তিনিও তিন-চার বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মুখমন্ডল বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। এখন অনেকটা সুস্থ আছেন চিকিৎসার ফলে। তিনি অবশ্য আগে ধূমপান করতেন। স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার প্রায় ২০ বছর আগে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবুও স্ট্রোকে আক্রান্ত হলেন। আমার পরিচিত অনেকের অনেক মহিলা আত্মীয় স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার কথা মাঝে মাঝে শুনি।


সামাজিক যোগাযোগের একটি মাধ্যমে একবার আমার বন্ধুদেরকে একটি পোস্টের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করে দেখলাম, তাদের কোনো আত্মীয় বা পরিচিতজন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন কিনা। যে উত্তরগুলো পেলাম, সেগুলো এবং আমার হাতে যে উদাহরণগুলো ছিল, সবগুলো মিলিয়ে দেখলাম, পুরুষের চেয়ে মহিলারাই যেন একটু বেশি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। অন্য কেউ আমার মতো এরকম খুঁজে দেখলে বিপরীত চিত্রও ভেসে উঠতে পারে। তবে এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, পুরুষদের পাশাপাশি অনেক মহিলাও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। আর পুরুষদের মধ্যে অনেক অধূমপায়ীও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। আমার মনে হয়, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এরকম স্ট্রোকে আক্রান্ত ১০০ জন মানুষের হিসেব নেয়া হলে দেখা যাবে, এদের দুই তৃতীয়াংশের মতোই হচ্ছে অধূমপায়ী মহিলা এবং পুরুষ। তাহলে বাকি এক তৃতীয়াংশ মানুষ ধূমপানের কারণেই যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন, তা কিভাবে বলা যাবে? ধূমপান না করলে যে তারা স্ট্রোক থেকে রক্ষা পেতেন, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? ধূমপান যারা করেন না, যদি তারা কেউই স্ট্রোকে আক্রান্ত না হতেন এবং কেবল ধূমপায়ীরাই স্ট্রোকে আক্রান্ত হতেন, তাহলে বলার সুযোগ থাকতো, ধূমপানে স্ট্রোক হয়। ধূমপান যদি স্ট্রোকের জন্য দায়ী হতো, তাহলে সব ধূমপায়ী বা অধিকাংশ ধূমপায়ী বা যারা বেশি ধূমপান করেন, তারা ব্যাপকহারে স্ট্রোকে আক্রান্ত হতেন, যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক পরিশ্রমহীন মোটা মানুষগুলো হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ এ রোগগুলোতে ব্যাপকহারে আক্রান্ত হয়।

আমার এক জেঠাতো ভাই ছিলেন, বয়স ৬০ বছরের বেশি হবে, নাম আবুল বাশার। আমি আমার শৈশবকাল থেকে দেখে এসেছি তিনি ধূমপান করছেন। মৃত্যুর আগেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নয়, রাতে শোয়া পর্যন্ত ধূমপান করতেন। দৈনিক ২০ টির বেশি সিগারেট খেয়েছেন ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে, কিন্তু স্ট্রোকে আক্রান্ত হননি! ধূমপানের বিরুদ্ধে যদি বিশ্বব্যাপী এমন নেতিবাচক প্রচারণা না হতো, এরকম লোকদের দেখলে বরং মানুষের মনে হতো, ধূমপান করলেই মানুষ স্ট্রোক থেকে রক্ষা পায়!

এ লেখা যারা পড়ছেন, তারা তাদের পরিচিতজনদের মধ্যে এমন অসংখ্য লোক খুঁজে পাবেন, যারা দৈনিক ২০টির বেশি সিগারেট খেয়ে আসছেন ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে, কিন্তু স্ট্রোক এখনো তাদের টিকিটিও ছুঁতে পারেনি। অথচ ধূমপান স্ট্রোকের কারণ বলে যেভাবে প্রচার করা হয়, মনে হয়, ধূমপান করলে আর কিছু না হোক, স্ট্রোক থেকে রক্ষার সুযোগ নেই!

বাস্তবতা হচ্ছে, চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে ধূমপান করেও বিশ^ব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষের সাথে স্ট্রোকের কোনো সম্পর্কই সৃষ্টি হয়নি। কথাটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হলে মাঠে নেমে পড়ুন। দেখবেন বাস্তবতা সত্যিই কথাটি সমর্থন করছে জোরালোভাবে। আমি শুধু এরকম একটি উদাহরণ দিচ্ছি।

আমাদের বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে এক বাড়ির দু’জন লোককে আমি অনেক আগ থেকেই চিনি। সহোদর ভাই। একজনের নাম মাহফুজ, আরেকজনের নাম ইলিয়াস। উভয়ের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। মাহফুজ নামক ভদ্রলোককে একদিন ধূমপান করতে দেখে আমি বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি ধূমপান করছেন কত বছর ধরে?’ তিনি বললেন, ‘প্রায় চল্লিশ বছর ধরে।’ এরপর আমি নতুন কিছু জিজ্ঞেস করতে না করতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘এ চল্লিশ বছরে আমি যতগুলো সিগারেট খেয়েছি, সবগুলো লম্বালম্বি উপরের দিকে দাঁড় করানো হলে আকাশ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে!’ তাঁর মন্তব্যটি শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। নিজের সিগারেট খাওয়া সম্পর্কে এরকম কথা বলতে আমি আর কাউকে শুনিনি। আকাশের দূরত্ব সম্পর্কে তাঁর ধারণায় যথেষ্ট ত্রুটি রয়েছে বলেই মনে হয় তিনি এমন কথা বললেন। অথবা তাঁর সিগারেট খাওয়ার আধিক্য বোঝাতে কথাটি বললেন। একটু বেশি বাড়িয়ে বলে ফেললেন। যাহোক লোকটি এখনো সুস্থ। আমি এরপর জিজ্ঞেস করলাম, ‘ধূমপান করলে কি কোনো ক্ষতি হয়?’ তিনি বললেন, ‘ধূমপান করলে অবশ্যই ক্ষতি হয়।’ আমি বললাম, ‘আপনার এখনো কোনো ক্ষতি হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘আমার হয়নি। তবে ধূমপানে ক্ষতি আছে।’ আমি তখন বললাম, ‘আপনার জানামতে কারো ক্ষতি হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘আমার জানামতে কারো ক্ষতি হয়নি।’ আমি আর কথা বাড়াইনি।

এবার তাঁর ভাই ইলিয়াসের কথায় আসি। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক কালের কন্ঠে তাঁকে নিয়ে একটি সংবাদ ছাপা হয়। সংবাদটি ছিল একটি নিখোঁজ সংবাদ, যার শিরোনাম হলো, ‘রাজধানীর হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ ইলিয়াস আলি’। সংবাদে বলা হয়, রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মো. ইলিয়াস আলি (বয়স ৭৫) নামের এক ব্যক্তি গত রবিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) নিখোঁজ হয়েছেন। জানা গেছে, ভর্তি থাকা অবস্থায় কাউকে না বলে স্বজনদের চোখের আড়ালে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান তিনি, এরপর আর হাসপাতালে ফেরেননি। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে খুঁজেও সন্ধান মেলেনি তাঁর। ইলিয়াস আলির ছোট ছেলে রিয়াজুল ইসলাম জানান, ‘গত বছর বাবা ব্রেন স্ট্রোক করেন। এরপর নানা চিকিৎসায় তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ক’দিন আগে সমস্যা দেখা দিলে ধানমন্ডির শংকর এলাকার ইবনে সিনা হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট প্রফেসর ড. আব্দুল হাই এর অধীনে চিকিৎসা শুরু করি। এরই মধ্যে এমন ঘটনা ঘটলো।’
ইলিয়াস আলির গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানার পোদ্দার বাজার পোস্ট অফিসের রোকনপুর গ্রামে। তিনা গাজী বাড়ি বললেই সবাই চেনে। কেউ সন্ধান পেলে...

এই হলো সংবাটির মূল কথা। সংবাদটি প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যে তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেল। স্ট্রোকে আক্রান্ত ইলিয়াস আলি সম্পর্কে তাঁর নিকটস্থ লোক থেকে জানলাম, তিনি আগে ধূমপান করতেন। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে করছেন না। ধূমপান না করা সত্ত্বেও স্ট্রোকে আক্রান্ত হলেন। অথচ তাঁরই ভাই ৪০ বছর ধরে একনাগাড়ে ধূমপান করেও স্ট্রোক থেকে নিরাপদ আছেন! এ পরিচ্ছেদে শুরুর দিকে আমাদের বাড়ির পাশের এক বাড়ির (দর্জি বাড়ি) চৌধুরী নামক একজন লোক প্রসঙ্গে বলেছিলাম, ২০ বছর আগেই ধূমপান ছেড়ে দিয়েছিলেন, তবু স্ট্রোকে আক্রান্ত হলেন! আবার আমাদের পাশের বাড়ির (কাজী বাড়ি) কাজী সিরাজ নামে একজন লোক অনেক বছর ধরে ধূমপান করতেন, কিন্তু স্ট্রোকে আক্রান্ত হননি। এমনকি কাজী জাহাঙ্গীর নামে তাঁর আরেকজন ভাই ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ধূমপান করছেন, এখনো স্ট্রোক থেকে নিরাপদ আছেন।

কী মনে হয়? নিয়মিত ধূমপান করলেই কি তাহলে স্ট্রোক থেকে নিরাপদ থাকা যায়? আর ধূমপান ছেড়ে দিলে স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে হয়? মোটেই না। স্ট্রোকের কারণ এখনো রহস্যে ঢাকা। অনেক গবেষণায় বলা হয়, যে কারণে হৃদরোগ হয়, সে একই কারণে নাকি স্ট্রোকও হয় এবং যেসব কাজ হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক, সেসব কাজ স্ট্রোক প্রতিরোধেও সহায়ক। বিষয়টা যে এমন নয়, তা একটু পরেই আলোচনা করা হবে।

আপাতত এটা আমরা নিশ্চিত, স্ট্রোক ধূমপানের কারণে হয় না। কারণ অনেক অধূমপায়ীও সচরাচর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। যদি শুধু ধূমপায়ীদেরই স্ট্রোক হতো, অধূমপায়ীদের কারো না হতো, তাহলেই নিশ্চয়তার সাথে বলা যেতো, ধূমপানে আর কিছু না হোক, মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়।

কেউ কেউ বলতে পারেন, অনেক কারণেই স্ট্রোক হতে পারে, ধূমপানও সেসবের একটি। এভাবে অবশ্য আমিও বলতে পারি, অনেক কারণেই স্ট্রোক হতে পারে, চা পান করাও সেসবের একটি। কারণ জীবনে চা পান করেছে, এমন অনেক লোক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছে!

৩৭তম পর্ব:
https://waytogainlonglife.blogspot.com/2022/09/blog-post_86.html

Occupation: Teaching, Hobbies: Writing

0 Comments: