দীর্ঘজীবন লাভের উপায় (পর্ব-২৩) : মনমতো খেলেও রোগ হবে না কখন?
ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক এবং উচ্চ রক্তচাপের প্রকৃত কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় জানার মাধ্যমে
অধ্যায়-২৩
মনমতো খাওয়া যাবে, যদি...
‘মানুষ বাঁচার জন্য খায়, খাওয়ার জন্য বাঁচে না’- এটা কোনো নীতিবাক্য নয় যে অনুসরণ করতে হবে। পৃথিবীতে উপভোগ্য যে বিষয়গুলোর জন্য জীবন অর্থবহ মনে হয়, তার মধ্যে খাওয়াও অন্যতম। খাওয়া-দাওয়া, যৌবন, অর্থ-সম্পদ এরকম বিষয়গুলোর প্রতি মানুষের সহজাত টান না থাকলে জীবন মানুষের নিকট গুরুত্বহীন মনে হতো। সামর্থ আছে, কিন্তু মনের চাহিদামতো খাওয়াটা মনুষত্বের পরিপন্থী নয়। মনুষত্বের পরিপন্থী হচ্ছে, সামর্থ থাকার পরও আশপাশে যাদের সামর্থ নেই, তাদের ফেলে শুধু নিজে খাওয়া।
খেতে গিয়ে আবার ভোজনবিলাসী হয়ে গেলে তা-ও কিন্তু আমাদের শরীরের সহ্য হয় না। বিশেষ করে যখন কায়িক শ্রমের কোনো কাজের সাথে শরীরের সম্পর্ক না থাকে, তখন শরীরে দেখা দেয় রোগ-ব্যাধি। খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি দৈহিক শ্রমের কাজ করলে বেশি খাওয়ার কোনো প্রতিক্রিয়া আর সৃষ্টি হয় না। দৈহিক শ্রম শরীর থেকে ঘাম নয়, যেন মারাত্মক কিছু রোগের জীবাণুই ঝরিয়ে ফেলে। শরীরের বাড়তি তেল-চর্বি যেন ঘাম হয়ে ঝরে যায়। দৈহিক শ্রম শরীরকে তেল-চর্বিমুক্ত রেখে শরীরে নির্দিষ্ট কিছু রোগ সৃষ্টি হতে বাধা দেয়। তাই মনের চাহিদামতো খাওয়া যাবে, যদি সে অনুপাতে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ, খেলাধুলা বা ব্যায়াম করে ঘাম ঝরানোর অভ্যেস থাকে। এককথায়, পরিশ্রমের কাজ, ব্যায়াম বা খেলাধুলায় যারা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন, তারা চাহিদামতো খেতে পারবেন। কায়িক শ্রমের সাথে যখন দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যাবে, কায়িক শ্রমের যখন সুযোগ থাকে না, তখন শরীর ঠিক রাখার জন্য কম কম খাওয়া উচিত।
একটা কথা মনে রাখা চাই, কম খেলে মানুষ মরে না, বেশি খেলে মানুষ তাড়াতাড়ি মরে যায়। কিভাবে মরে, তা নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করে বলার আর প্রয়োজন নেই। মার্কিন রাজনীতিবিদ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের (১৭০৬-১৭৯০) একটা বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, ‘খুব কম মানুষকে দেখেছি না খেয়ে মরতে। খেয়ে এর থেকে বেশি মরেছে।’ তাঁর কথাটি আক্ষরিক অর্থে হয়তো পুরোই ভুল, কিন্তু রূপক অর্থে শতভাগ সঠিক। তাঁর কথায় ‘না খেয়ে মরা’র রূপক অর্থ নিশ্চয়ই ‘কম কম খাওয়া’, আর ‘খেয়ে মরা’র রূপক অর্থ নিশ্চয়ই ‘বেশি বেশি খাওয়া’।
কম খেয়ে বেশিদিন বেঁচে থাকার অসংখ্য উদাহরণ চোখে পড়ে। আমার নানী সবসময় একেবারে পরিমিত খাবার খান বলে এখনও অনেকটা সুস্থতার সাথে বেঁচে আছেন। ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারেন, নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলো অন্যের সাহায্য ছাড়াই করতে পারেন। তাঁর বয়স এখন কত, তা সরাসরি না বলে তাঁর বয়স এখন কত হতে পারে, সেজন্য তাঁর সম্পর্কে একটা চমৎকার তথ্য উল্লেখ করছি। আমার নানীর ভাই, বোন, ভাবী এবং ভগ্নীপতিদের কেউই যেমন বেঁচে নেই; তেমনি তাঁর স্বামী, দেবর, ভাসুর, ননদ, ননদজামাই এমনকি তাঁর দেবর-ভাসুরদের স্ত্রীরাও সবাই অনেক বছর আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর স্তরের সবার মধ্যে এখন শুধু তিনিই বেঁচে আছেন অনেকটা অলৌকিকভাবে! আমার এক সহকর্মী তাঁর কাকীর কথা সেদিন কথাপ্রসঙ্গে বললেন, যিনি সবসময় একটি ছোট বাটি পরিমাণ খাবার খান। কোনো অবস্থাতেই এর বেশি খান না। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, তাঁর সেই কাকীমা এখনও বেঁচে আছেন কলকাতায়, ৯৫ বছর বয়স নিয়ে! পক্ষান্তরে বেশি বেশি খেতে যারা অভ্যস্ত, তাদের করুণ পরিণতির অনেক বাস্তব উদাহরণ আমরা একটু খুঁজলেই দেখতে পাবো।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেতা নোবেলের খাদ্যাভ্যাস ও ফিটনেস সম্পর্কে ১৩ জুন ২০১৮ তারিখের প্রথম আলোর সাথে প্রকাশিত বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘ঈদ উপহার’-এ (পৃষ্ঠা-১৪) ‘চলি নিয়মমতো’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। সেখানে নোবেল বলেন, ‘অনেকেই জানতে চান, নিজেকে কিভাবে ‘ফিট’ রাখা যায়? আমার উত্তর খুব ছোট্ট- পরিমিত খাবার আর শরীরচর্চা। এতেই নিজেকে ফিট রাখা সম্ভব।
শরীর ভালো রাখা, নিজে ভালো থাকা কঠিন কিছু নয়। শুধু নিজের ভেতর সেই ইচ্ছা থাকা চাই। এরপর একটা রুটিন মেনে চললেই ভালো থাকা যায়। তার মানে এই না যে আপনি কোথাও যাবেন না, খাবেন না। আমার তো শুক্রবার এলেই খাবারের রুটিন বলে কিছু থাকে না। এদিন বার্গার থেকে বিরিয়ানি-সবই খাই। তবে পরদিন থেকেই আবার চলে আসি নিয়মের মধ্যে। অনেক সময় দাওয়াত থাকে নানা জায়গায়। সেখানে গিয়ে কিন্তু আমি সবই খাই। তবে সেটার পরিমাণ নিজেই ঠিক করে নিই। পেলাম আর খেলাম-এমন কখনো হয়নি। অতিরিক্ত খেলেই সমস্যা হবে।... প্রতিদিন অফিস করে আমি ক্লান্ত থাকলেও জিমে গিয়ে এক-দেড় ঘন্টা ঘাম ঝরাই।’
নোবেল সম্পর্কে লেখাটির পাশাপাশি ক্রোড়পত্রটির একই পৃষ্ঠায় এরকম আরেকটি লেখা ছাপা হয় টেলিভিশন উপস্থাপক শারমিন লাকি সম্পর্কে। সেখানে শারমিন লাকি নিজ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি নিজেকে স্বাস্থ্যসচেতন মনে করি। মুখরোচক খাবার সবার মতো আমিও খেতে পছন্দ করতাম। নিজেকে ফিট রাখতে কয়েক বছর ধরে সেগুলো এড়িয়ে চলি। মাংস খাই না প্রায় ২৪ বছর ধরে। কিন্তু মাছের নানা পদ, সবজি ও ফলমূল প্রচুর খাই।...
সুস্থতার জন্য খাবারের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও খাবার খেতে হবে হিসাব-নিকাশ করে। ওজন যেন না বাড়ে বা শরীর সুস্থ থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রোজা ছাড়া এমনিতে সারা বছর দিনে একবার শুধু দুপুরে ভাত খাই। রাতে রুটি, নুডলস ও ফলমূল খাওয়া হয়। সকালে হালকা কোনো নাশতা খাই।...
শরীর ভালো রাখতে আরও একটি বিষয় মেনে চলার চেষ্টা করি। তা হলো সব সময় হাসিখুশি থাকি। খেলাধুলার প্রতি আমার সবসময় আকর্ষণ আছে। নিয়মিত ব্যাডমিন্টন খেলি। এটা ভালো ব্যায়াম। শীতের সময় রাতে তিন-চার ঘন্টা ব্যাডমিন্টন খেলি আমি।...’
অতএব বেশিদিন পৃথিবীর আলো-বাতাসের সান্নিধ্যে থাকতে চাইলে, শরীর সুস্থ ও ফিট রাখতে চাইলে খাওয়া-দাওয়ায় অতিরঞ্জন পরিহার করা উচিত; চাহিদার চেয়ে একটু কম খাওয়া উচিত সবসময়। মনে রাখা দরকার, যতো কম খাওয়া যায়, ততো বেশি বেঁচে থাকার আশা করা যাবে। দীর্ঘজীবন লাভের রহস্য কম খাওয়া, চিকন থাকা আর শারীরিক পরিশ্রমের সাথে সম্পর্ক রাখার মধ্যে নিহিত।
২৪তম পর্ব:
https://waytogainlonglife.blogspot.com/2022/09/blog-post_91.html

0 Comments: