Headlines
Loading...
দীর্ঘজীবন লাভের উপায় (পর্ব-২৭) : উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগে আক্রান্তদের জন্য কিছু পরামর্শ

দীর্ঘজীবন লাভের উপায় (পর্ব-২৭) : উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগে আক্রান্তদের জন্য কিছু পরামর্শ

ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক এবং উচ্চ রক্তচাপের প্রকৃত কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় জানার মাধ্যমে


দীর্ঘজীবন লাভের উপায়                                                                    


                                                অধ্যায়-২৭

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগে আক্রান্তদের জন্য কিছু পরামর্শ

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগে যারা এখনো আক্রান্ত হননি, এ লেখা মূলত তাদের উদ্দেশ্যে। তবু এসব রোগে যারা ইতোমধ্যে ধরাশায়ী হয়ে বিপদে আছেন, তাদের কল্যাণে কিছু পরামর্শ উল্লেখ করা হচ্ছে।
প্রথম কথা হচ্ছে, এসব রোগ থেকে হয়তো আপনি পুরোপুরি মুক্তি পাবেন না কখনো, তবে আগের মতো অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠতে পারবেন কিছু বিষয় অনুসরণ করলে।

* নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যেস করুন। রোগ দেখা দিলে প্রথম অবস্থায় একটু কম সময় ব্যায়াম করুন। দৈনিক ১৫ থেকে ২০ মিনিট। ধীরে ধীরে ব্যায়ামের সময় বাড়িয়ে ফেলুন। রোগের প্রাথমিক অবস্থা হলে নিয়মিত ব্যায়ামের ফলে রোগের মাত্রা অনেক কমে যাবে। অনেকের ডায়াবেটিস ভালো হয়ে যাবার উদাহরণও আছে শুধু শারীরিক শ্রম বা ব্যায়ামে অভ্যস্ত হবার পর। উচ্চ রক্তচাপের তীব্রতাও কমে যেতে পারে নিয়মিত ব্যায়ামের ফলে। কারণ নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের মেদ-চর্বি কমিয়ে ফেলে। মেদ-চর্বি কমে গেলে উচ্চ রক্তচাপ কমে যাওয়াও স্বাভাবিক। হার্ট ব্লকেজ বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগীদের বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে নিয়মিত ব্যায়ামের কারণে।

‘হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে যা করবেন’ শিরোনামে একটি নিবন্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. রাজাশিস চক্রবর্তী বলেন, ‘যোগব্যায়াম আপনার শরীরের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে; হৃদস্পন্দন সঠিক রাখতে সাহায্য করে। যোগব্যায়াম দেহের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কাজ করে। তাই হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে যোগব্যায়াম করতে পারেন।’  [দৈনিক যুগান্তর, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭]

‘প্রসঙ্গ উচ্চ রক্তচাপ’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তরের ২৬ আগস্ট ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লেখক মো. আবু জাফর সাদেক বলেন, ‘স্টাডিতে দেখা যায়, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম যেমন-- হাঁটা, দৌড়ানো, সাইক্লিং, সাঁতারকাটা প্রভৃতির মাধ্যমে ১০ মিলিমিটার পারদচাপ পর্যন্ত রক্তচাপ কমানো যেতে পারে।’

* এসব রোগে আক্রান্তদের জন্য ব্যায়াম হিসেবে হাঁটাহাঁটিই বেশি নিরাপদ। কারণ দৌড় বা জগিংয়ে হঠাৎ হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। মর্নিং ওয়াকের অভ্যেস করুন। সকালে নিরিবিলি পরিবেশে দৈনিক বিশ থেকে চল্লিশ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা উচিত, একঘন্টা বা তারচেয়ে বেশি হাঁটতে পারলে বেশি ভালো। আস্তে আস্তে রিলাক্স মুডে না হেঁটে একটু জোরে জোরে হাঁটতে হবে। রিলাক্স মুডে হেঁটে তেমন লাভ নেই।


‘ডায়াবেটিস ও খাওয়া-দাওয়া’ শিরোনামে একটি নিবন্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘ডায়াবেটিস নিরাময়ে খাওয়া-দাওয়ার ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ব্যায়ামেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। ডায়াবেটিসের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর হল ওবিসিটি। তাই ওজন কমাতে ইনসুলিন লেভেল স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা উচিত।’ [দৈনিক যুগান্তর, ১২ নভেম্বর ২০১৬]

‘কেন হাঁটবেন কখন হাঁটবেন?’ শিরোনামে আরেকটি নিবন্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ‘প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁচ দিন হাঁটলে আর শরীরের ওজন ৭ শতাংশ কমালে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমে প্রায় শতকরা ৫৮ ভাগ। আর যদি ডায়াবেটিস হয়েই থাকে তবে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও হাঁটা বিশেষ কার্যকর। শরীরের পেশিতে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ে হাঁটাহাঁটি করলে। ফলে রক্তে গ্লুকোজ কমে আর ডায়াবেটিসের ওষুধ কম লাগে।’ [বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭]

* তবে সাইক্লিং করাটাও অনেকটা হাঁটাহাঁটির মতো। সাইকেল বেশি জোরে চালানোর প্রয়োজন নেই। কয়েক মাস চালানোর পর ধীরে ধীরে একটু জোরে চালানোর অভ্যেস করা যাবে। কিছুটা জোরে চালানোতেই উপকার বেশি। দৈনিক চল্লিশ মিনিটের বেশি সাইকেল চালানো উচিত।

* যে কোনো ব্যায়াম করুন না কেন, শরীর থেকে ঘাম বের করা উদ্দেশ্য। শরীর থেকে যতো ঘাম বের হবে, ততো শরীর দূষণমুক্ত হবে তথা অতিরিক্ত মেদমুক্ত হবে। মেদ যতো কমানো যাবে, ততো শরীর রোগের ঝুঁকিমুক্ত হবে। মাথায় চুল লম্বা লম্বা হলে তাতে উঁকুন বাসা বাঁধার সুযোগ পায়, চুল ছোট থাকলে উঁকুন বাসা বাঁধার সুযোগ পায় না। এভাবে শরীরে মেদ-চর্বি বেড়ে গেলে যেসব রোগ বাসা বাঁধার সুযোগ পায়, মেদ-চর্বি কম থাকলে সেসব রোগও অনুপ্রবেশের সুযোগ পায় না।

* শরীরের ওজন কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন। ওজন যতো কমিয়ে ফেলবেন, মেদ-চর্বি ততো কমে যাবে, রোগের শক্তিও কমে যাবে যুগপৎভাবে।

* খেলাধুলার সুযোগ থাকলে মিস করবেন না। পরিশ্রমের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করুন বেশি বেশি। আনন্দও পাবেন, উপকারও হবে।

* ব্যায়ামের সময় বন্ধু বা সঙ্গী রাখুন কাউকে। কোনা সমস্যা দেখা দিলে আপনার পাশে দাঁড়াতে পারবে।

* চিকিৎসকের পরামর্শ নিন নিয়মিত। নিয়মিত ঔষধ সেবন করুন। ঔষধ সেবনে অনিয়ম যেনো না হয়।

* যেসব খাবার খেলে রোগ বেড়ে যেতে পারে, সেগুলো অবশ্যই এড়িয়ে চলুন। চর্বিযুক্ত খাবার তো অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে। জীবনে খাওয়া-দাওয়া ছাড়া আনন্দের অনেক কিছু আছে। সেসবে মনোযোগী হোন। সামান্য খাবারের জন্য জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না।

* চাহিদার চেয়ে কম খেতে অভ্যস্ত হোন। যতো কম খাবেন, শরীর ততো ভালো থাকবে। আবারও বলছি, কম খেলে মানুষ মরে না, বরং বেশি দিন বেঁচে থাকে; বেশি খেলে মানুষ খাওয়ার উপযোগিতাও হারায় দ্রুত, বাঁচেও না বেশিদিন। এমন উদাহরণে সমাজ ভরপুর।

* আরেকটি কথা। হার্ট অ্যাটাকের রোগীরা বিভিন্ন কারণে কেউ শরীরে রিং বসান, কেউ বাইপাস সার্জারী করেন। এ দু’টোর মধ্যে কোনটা উত্তম? দেখা গেছে, রিং বসালে সাময়িক সুস্থ হলেও পরে আবার হার্টে ব্লক দেখা দেয়। রিং বসানোর পরও বাইপাস সার্জারীর প্রয়োজন দেখা দেয় অনেকের। অনেকে বাইপাস সার্জারী করেও। কিন্তু বাইপাস সার্জারী করলে পরে আর রিং বসানোর প্রয়োজন হয় না, রোগী অনেকদিন সুস্থ থাকে। বাইপাস সার্জারী করে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার অনেক উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়। বাইপাস সার্জারী করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগী প্রায় সুস্থ হয়ে যায়। বলা যায়, বাইপাস সার্জারী করলে রোগী হৃদরোগে আক্রান্ত হবার আগে যেরকম সুস্থ থাকে, অনেকটা সেরকম সুস্থ হয়ে যায়। বিষয়টা বাস্তব অনেকগুলো ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে বলা হয়েছে।

এছাড়া এ তিনটি রোগ যেহেতু শরীরে চর্বি বৃদ্ধিজনিত কারণে হয়ে থাকে, তাই এসব রোগে আক্রান্তরা নিয়মিত চর্বি নিয়ন্ত্রষের ঔষধ (যেমন: স্ট্যাটিন) সেবন করলে রোগ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং অপেক্ষাকৃত বেশি দিন বেঁচে থাকার সুযোগ পায়।

এ সম্পর্কে দৈনিক ইনকিলাবে ৪ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত ‘হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় স্ট্যাটিন’ শিরোনামে একটি লেখায় বলা হয়েছে, ‘স্বাস্থ্যবান মানুষ তাদের হৃদরোগ সমস্যার ঝুঁকি কমাতে পারে। যদি তারা আগে থেকেই স্ট্যাটিন নামে পরিচিত কোলেসটেরল কমানোর ওষুধ খাওয়া শুরু করে, তাহলে তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে বলে গবেষাণায় বলা হয়েছে। ২১টি দেশের ১৩ হাজারের বেশি লোকের ওপর পরিচালিত এই ব্যাপকভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণার ফলাফল থেকে এ তথ্য মিলেছে। শিকাগোতে আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি কনফারেন্সে শনিবার গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। হৃদরোগের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা লোকজনদের জন্য এখন পর্যন্ত মূলত স্ট্যাটিনস ওষুধটি সেবনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। হৃদরোগে প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ লোক মারা যায় এবং প্রায় ৫ কোটি লোকের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের কারণ হৃদরোগ।

ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির মেডিসিনের সিনিয়র গবেষক অধ্যাপক সেলিম ইউসুফ বলেন, এই ওষুধটি ব্যবহারের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তিনি বলেন, আমি মনে করি, আমরা আগে যেভাবে ব্যবহার করেছি এখন তার চেয়ে অনেক বিস্তৃতভাবে স্ট্যাটিনস ওষুধটি ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

‘হার্ট আউটকামস প্রিভেনশান ইভাল্যুশান-থ্রি (এইচওপিই-থ্রি)’ নামে পরিচালিত এই গবেষণায় যেসব বিষয়কে বিবেচনায় নেয়া হয় সেগুলো হচ্ছে, স্ট্যাটিনস ব্যবহারের প্রভাব পরীক্ষা, পৃথিবীব্যাপী বৈচিত্র্যপূর্ণ লোকজনের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ কমানোর ওষুধের সঙ্গে কখনো কখনো রোগীর মন রাখার জন্য দেয়া ওষুধের (প্ল্যাসবো পিল) সঙ্গে স্ট্যটিনের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়গুলোর মূল্যায়ন।...’ [https://www.dailyinqilab.com/article/12526]


প্রথম আলোর সাথে প্রকাশিত ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’র ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫ সংখ্যায় ‘হৃদয়ঘটিত সমস্যা?’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যা লিখেন আব্দুল কাইয়ুম। সেখানে বলা হয়, ‘রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। তাই স্ট্যাটিন খেতে হয়, এটা কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ। সমস্যা দেখা দেয় যখন কোনো রোগী স্ট্যাটিন খেতে পারেন না বা চান না। তখন কী করবেন? এর একটা উপায় হতে পারে হৃদযন্ত্র স্ক্যান করে দেখা যে তাঁদের হার্টে ব্লক আছে কি না, থাকলে ঝুঁকি কতটা, কোলেস্টেরল কমানোর জন্য স্ট্যাটিন খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটা। চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ বছরের বেশি বয়সের অন্তত পাঁচ কোটি ব্যক্তি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে স্ট্যাটিন সেবন করেন।’

নিবন্ধটিতে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাকা) কার্ডিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সজল ব্যানার্জি বলেন, হৃদরোগের লক্ষণ থাকলে স্ট্যাটিন খাওয়া ভালো।’

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ৫ অক্টোবর ২০১৫ [https://www.prothomalo.com/pachmisheli/article/702778]


২৮তম পর্ব:
 https://waytogainlonglife.blogspot.com/2022/09/blog-post_41.html


Occupation: Teaching, Hobbies: Writing

0 Comments: