Headlines
Loading...
দীর্ঘজীবন লাভের উপায় (পর্ব-২৬) : শিশুদেরকে খেলতে দিন

দীর্ঘজীবন লাভের উপায় (পর্ব-২৬) : শিশুদেরকে খেলতে দিন

ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক এবং উচ্চ রক্তচাপের প্রকৃত কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় জানার মাধ্যমে


দীর্ঘজীবন লাভের উপায়


অধ্যায়-২৬
শিশুদেরকে খেলতে দিন

শিশুদেরকে মোটা হতে দেখা আমরা প্রায় সবাই পছন্দ করি। কিন্তু মোটা হতে গিয়ে যে ওরা অনেক রোগের ঝুঁকিতে পড়ে, তা নিয়ে আমরা মোটেই ভাবি না। ইদানিং অনেক শিশু সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও বিস্ময়করভাবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত দু’টি শিশুকে তো আমি নিজেই দেখেছি। আমার পরিচিত দু’জন লোকের (একজন আমার সহকর্মী, আরেকজন আমার ছাত্র) মুখে আরো দু’টি শিশুর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার কথা জানতে পেরেছি। তাছাড়া শিশুরা যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে, তা এখন বিশে^র সচেতন প্রায় সবাই জানে। উচ্চ রক্তচাপেও ইদানিং শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত কোনো শিশু এখনো আমি না দেখলেও ১৭ মে ২০১৭ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকে উচ্চ রক্তচাপ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে দেখলাম, ‘বর্তমান বিশ্বে শতকরা ৫ জন শিশু উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।’

কোন্ বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি, এ বিষয়ে বাংলাদেশের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল এনটিভির নিয়মিত আয়োজন ‘স্বাস্থ্য প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানের ২৯৭১তম পর্বে কথা বলেন কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নূর আলম। অনুষ্ঠানটির পুরো আলোচনাটি ফিচার আকারে প্রকাশিত হয় এনটিভির ওয়েবসাইটে ২০ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে ‘কোন্ বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি?’ শিরোনামে। আলোচনায় ডা. নূর আলম বলেন, ‘আসলে আগে মনে করা হতো, বয়স কম, হার্ট অ্যাটাক হবে না। মনে করা হতো কম বয়সে হার্ট অ্যাটাক হয় না। সাধারণত প্রবীণদের হার্ট অ্যাটাক হতো, তবে আমরা এখন যেটা দেখছি, তরুণ বয়সেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এটি স্বাভাবিক। তবে ৩০ থেকে ৪৫, এই বয়সে হার্ট অ্যাটাকটা হয়। খুব প্রবীণদের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী যারা, তাদের হার্ট অ্যাটাকটা বেশি হয়। তারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এ বিষয়ে। তবে যেকোনো বয়সেই হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।’

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন শিশুরাও এখন এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে?

‘উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় বিবিসি বাংলায় ১৭ মে ২০১০ তারিখে। সেখানে বলা হয়, ‘এখনকার যারা শিশু কিশোর তারা ছোটবেলা থেকে খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে না এবং কোনো শারীরিক পরিশ্রমও নেই। এরা যখন বড় হচ্ছে তারা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হচ্ছে,’ বলেন ডা: বদিউজ্জমান।’ [https://www.bbc.com/bengali/news/2010/05/100517_tbbdhypertension]

‘কেন শিশুদের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগ বাড়ছে’ শিরোনামে বিবিসি বাংলায় ১৩ অগাস্ট ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ডায়াবেটিসের সবচেয়ে বড় হুমকি ওজন বেড়ে যাওয়া। যেসব শিশুর এই রোগ হচ্ছে তাদের দুই-তৃতীয়াংশেরই শরীরের ওজন বেশী।’ প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, ‘চিকিৎসকরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুদের শরীরে টাইপ ২ ডায়াবেটিস বেশী ক্ষতি করে। সুতরাং বাচ্চাদের ওজন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিলে, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচেছ। দ্রুত ওজন কমানোর জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরী।

আর যদি দেখা যায় ইতিমধ্যেই শিশু আক্রান্ত হয়েছে, শরীর চর্চা থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে কঠোর শৃঙ্খলা পালন করতে হবে।’ [https://www.bbc.com/bengali/news-40916558]

দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, আমরা অনেকে এখনো শিশুদের এসব রোগে আক্রান্ত হবার সংবাদ জেনেও নিজের শিশুর মোটা হওয়া নিয়ে সতর্ক হই না। শিশুকে খেলতে দিই না, শিশুকে চিকন রাখতে সচেষ্ট হই না। বরং শিশুকে মোটা দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে যাই, সারাদিন শুধু খাওয়ার উপর রাখার চেষ্টা করি।

এমন আত্মঘাতি প্রবণতা পরিহার করে শিশুদেরকে ঠিকমতো খাওয়ানোর পাশাপাশি খেলাধুলা করতে দেয়া উচিত। বিশেষ করে দৌড়াদৌড়ি করতে হয় যেসব খেলায়, সেসব খেলা। শুধু বসে বসে খাওয়ালে অবশ্যই সে একসময় রোগাগ্রস্থ হয়ে পড়বে।

হ্যাঁ, শিশুদেরকে বেশি বেশি খাওয়ানো যাবে, তবে পাশাপাশি বেশি বেশি খেলতেও দিতে হবে। আমাদের বিদ্যালয়ে সংঘটিত একটি ঘটনা। ২০১৭ সালের কোনো একদিন পঞ্চম শ্রেণিতে গিয়ে দেখি কয়েকজন শিক্ষার্থীর চোখে-মুখে ঘাম। ওটা ছিল প্রথম পিরিয়ড। বুঝলাম, নিশ্চয়ই মাঠে দৌড়াদৌড়ি করেছে। বিষয়টা জেনেও ওদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমাদের কী হয়েছে? ঘেমে গেছো কেন? বাইরে নিশ্চয়ই খেলেছো?’ ওরা স্বীকার করলো। ওদের বললাম দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে আসতে। ওরা ফিরে আসার পর সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলাম, ‘এভাবে দৌড়াদৌড়ির খেলা করা কি ভালো?’ কয়েকজন বললো, ‘জ্বি না, স্যার।’ অনেকে নীরব রইলো। বললাম, ‘সবাই বলো না কেন?’ এবার সবাই জোরে বললো, ‘জ্বি না, স্যার।’

আমি তখন বললাম, ‘সব সময় এরকম দৌড়াদৌড়ি করতে হয়, এমন খেলা খেলবে!’ বিস্ময়ে ওরা আমার দিকে চেয়ে রইলো। আমি আরো বললাম, ‘দৌড়াদৌড়ির খেলা খেললেই শরীর ভালো থাকে। আমাদের শরীর সুস্থ রাখতে হলে নিয়মিত ব্যায়াম করা দরকার। খেলাধুলা করলে খেলার পাশাপাশি ব্যায়ামের কাজটাও হয়ে যায়। তাই সবসময় এভাবে দৌড়াদৌড়ি আছে যেসব খেলায় সেসব খেলা বেশি বেশি খেলবে।’ এবার সবাই বুঝলো বিষয়টা।

শিশুদেরকে আমরা অনেক অভিভাবক ইদানিং খেলতে তো উৎসাহিত করিই না, বরং সময়ের চাহিদা মনে করে ওদের হাতে তুলে দিই স্মার্টফোন, ট্যাব এসব। অনেক ‘সচেতন’ অভিভাবকও শিশুদেরকে উজ্জ্বল স্ক্রীণের এসব ডিজিটাল ডিভাইস কিনে দিয়ে আনন্দ পাই। শুধু তা-ই নয়, অন্যের কাছে গর্বের সাথে বলেও বেড়াই, ‘আমার ... বছরের বাচ্চা ফোনের এমন অনেক কিছু জানে, আমি নিজেও যেগুলো জানি না!’

বিশ্বব্যাপী শিশুরা বিগত কয়েক বছর ধরে মুটিয়ে যাচ্ছে, সাথে সাথে নানারকম রোগে রোগাগ্রস্থও হয়ে যাচ্ছে ব্যাপক হারে। কারণ? কারণ আর কিছু নয়, এই স্ক্রীণাসক্তি। টিভির স্ক্রীণের সাথে এখন খুব শক্তিশালী হয়ে যোগ দিয়েছে মোবাইল-ট্যাব-ল্যাপটপের স্ক্রীণ। স্ক্রীণে স্ক্রীণেই এখন অনেক শিশু দিনের একটা বড় সময় কাটিয়ে দেয়। বাইরে অন্য শিশুদের সাথে খেলাধুলার সময় কই!

৩১ মার্চ ২০১৭ সংখ্যার দৈনিক ইত্তেফাকে ‘আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুদের দৃষ্টি সমস্যা’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিবেদনটিতে শিশুদের স্ক্রীণাসক্তির মারাত্মক পরিণতির অনেক উদাহরণ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, চক্ষু হাসপাতালসমূহে ইদানিং শিশুরোগীর সংখ্যা অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল, ট্যাব এসবের উজ্জ্বল স্ক্রীণে দীর্ঘক্ষণ চোখ আটকে রাখার পরিণতিতে শিশুদের চোখে নানারকম রোগ দেখা দিচ্ছে। [https://archive1.ittefaq.com.bd/print-edition/last-page/2017/03/31/185978.html]

৩ মার্চ ২০১৮ সংখ্যার দৈনিক যুগান্তরে ‘প্রযুক্তির কারণে পেনসিল ধরতে সমস্যা হচ্ছে শিশুদের’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। তাতে বলা হয়, ‘বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির প্রতি আসক্তির কারণে পেনসিল দিয়ে লেখালেখি করতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ছে শিশুরা। টাচস্ক্রিণ ডিভাইসের সামনেই বেশি সময় কাটাচ্ছে তারা, ফলে পেনসিল ধরতেও তারা ভুলে যাচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের পেডিয়াট্রিক অকুপেশনাল থেরাপিস্ট স্যালি পেইন বিষয়টি জানান সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে।...দ্য গার্ডিয়ানকে ইংল্যান্ডের রয়্যাল কলেজ অব অকুপেশনাল থেরাপিস্টের সহকারী পরিচালক কারিন বিশপ বলেন, ‘প্রযুক্তির প্রভাবে বদলে যাওয়া এক বিশ্বে বেড়ে উঠছে আমাদের শিশুরা। নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনে প্রযুক্তির অনেক ইতিবাচক প্রভাব আছে। কিন্তু প্রযুক্তির কারণে আমরা যে অলস হয়ে পড়ছি এটা নিশ্চিত। প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কারণে শিশুরা অনলাইনে, ঘরে বসে বেশি সময় কাটাচ্ছে, খেলাধুলা বা শরীরচর্চায় সময় কাটাচ্ছে কম।’

শিশুদেরকে ট্যাব, স্মার্টফোন ব্যবহারের স্বাধীনতা দেয়া যে আত্মবিধ্বংসী, তা আশা করি সবাই উপলব্ধি করতে পেরেছেন প্রতিবেদনগুলো দেখে। অতএব শিশুদেরকে উজ্জ্বল স্ক্রীণযুক্ত ডিভাইস কিনে দিয়ে নয়, ক্রীড়াসামগ্রী কিনে দেয়ার মধ্যেই প্রশান্তি খুঁজুন। নিজে ব্যায়াম করার সময় ওদেরকে সাথে রাখুন, ওদেরকেও কিছু কিছু ব্যায়াম করতে শেখান। মুটিয়ে যেতে দেবেন না, চিকন রাখতে চেষ্টা করুন, ওদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে।

২৭তম পর্ব:
https://waytogainlonglife.blogspot.com/2022/09/blog-post_92.html

Occupation: Teaching, Hobbies: Writing

0 Comments: